রণাঙ্গনে রক্তবীজের রক্ত পান থেকে রামচন্দ্রের নীলপদ্ম অর্পণ— বৈদিক পুরাণের উগ্রচণ্ডা মহাকালী কখন বাঙালির ঘরের মেয়ে ‘উমা’ হয়ে উঠলেন? ৫০ হাজার কোটির উৎসব অর্থনীতির আড়ালে শারদোৎসবের রূপবদল
শরতের সাদা মেঘের ভেলা আর ভোরের শিউলির গন্ধে ঘুম ভাঙা বাংলায় কাশফুলের দোলা কেবল ঋতুবদলের সঙ্কেত দেয় না; তা বহন করে আনে বাঙালির শিকড়-ছোঁওয়া এক চিরন্তন উৎসবের বার্তা। ঘরের মেয়ে উমার বাপের বাড়িতে ফেরার আবেগেই মাতোয়ারা হয় আপামর বাঙালি। যুগ যুগ ধরে এই শারদোৎসব বাঙালির কৃষ্টি ও যাপনের এমন এক চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে, যা কেবল ধর্মীয় অনুশাসনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির অস্তিত্বের পরিচায়ক। বর্তমান সময়ে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই পুজোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার এক সুবিশাল অর্থনীতি। মৃৎশিল্পী, মণ্ডপশিল্পী, আলোকসজ্জা, ঢাকি, পুরোহিত থেকে শুরু করে বস্ত্র ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ—প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ মানুষের রুটিরুজি জড়িয়ে থাকে এই মহোৎসবের সঙ্গে।
এই উৎসবের শিকড় প্রোথিত রয়েছে সুপ্রাচীন পুরাণে। মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’ অনুযায়ী, মর্ত্যে দেবীর আরাধনার প্রথম সূত্রপাত রাজা সুরথ ও বণিক সমাধির হাত ধরে। স্বজন ও মন্ত্রীদের চক্রান্তে সর্বস্ব হারিয়ে গভীর অরণ্যে মহর্ষি মেধার আশ্রমে আশ্রয় নেন তাঁরা। মহামায়ার মোহজাল ও আদি রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে ঋষি শোনান—সৃষ্টির ঊষালগ্নে বিষ্ণুর কর্ণমল থেকে উৎপন্ন মধু ও কৈটভকে বধ করার জন্য দেবী মহামায়ার প্রথম আবির্ভাব। পরবর্তী কালে মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতারা স্বর্গচ্যুত হলে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহাদেবের সম্মিলিত তেজ থেকে জন্ম নেন দশভুজা আদ্যাশক্তি। দেবতাদের দিব্য অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মহিষাসুরমর্দিনী রূপে অসুরদলন করেন তিনি।
এরপর শুম্ভ ও নিশুম্ভের ত্রাস থেকে সৃষ্টিকে রক্ষা করতে দেবীর দেহকোষ থেকে আবির্ভূতা হন দেবী কৌশিকী। সেই যুদ্ধেই অসুর সেনাপতি চণ্ড ও মুণ্ডকে নিকেশ করতে দেবী ধারণ করেন করালবদনা চামুণ্ডার রূপ। হুঙ্কারে ভস্মীভূত হন ধুম্রলোচন। রক্ত মাটিতে পড়লেই কোটি অসুরের জন্মের বর পাওয়া রক্তবীজকে বধ করতে দেবী নেন উগ্রচণ্ডা মহাকালীর রূপ—রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা গ্রাস করে নেন তিনি। অবশেষে শুম্ভ ও নিশুম্ভকে বধ করে ত্রিভুবন ভারমুক্ত করেন জগজ্জননী। ঋষি মেধার উপদেশে গভীর তপস্যার পর দেবী দর্শন পেয়ে রাজা সুরথই প্রথম শরৎকালে মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে পুজো শুরু করেন।
পুরাণ পেরিয়ে ত্রেতাযুগে রামায়ণে মেলে দেবীর অন্য এক আখ্যান। মহাদেবের বরে বলীয়ান রাবণকে বধ করতে রামচন্দ্র শরণাপন্ন হন মহাশক্তির। শাস্ত্র অনুযায়ী শরৎকাল দেবতাদের সুপ্তিকাল হলেও, শ্রীরামচন্দ্র দেবীর অকালবোধন করেন। নীলপদ্ম অর্পণে তুষ্ট দেবী বর দেন রঘুপতিকে। অন্য দিকে দ্বাপর যুগেও মহাভারতের বিরাটপর্ব ও ভীষ্মপর্বে পাণ্ডবদের বিপদে রক্ষা ও কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে জয়ের স্বার্থে শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে অর্জুন ও যুধিষ্ঠির দেবী দুর্গার স্তব করেছিলেন।\
পৌরাণিক ও মহাকাব্যের যুগে দেবীকে মূলত দেবালয় কিংবা রণাঙ্গনের গম্ভীর রূপে দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে দেবী পরাক্রমশালী শক্তির আদি উৎস। যুদ্ধের সময় দেবীর কোনো পুরুষ সঙ্গী নেই। বরং দেবতাগণ দেবীর কাছেই সমর্পিত। শিব সেখানে জড়। এই মহাকালের নিয়ন্ত্রক দেবী এখানে কালী, আদ্যাশক্তি।
তবে পুরাণ ও মহাকাব্যের সেই রণচণ্ডী, অজেয় পরাশক্তি বাংলায় প্রবেশ করে এক অদ্ভুত রূপবদল ঘটিয়েছে। মঙ্গলকাব্যের হাত ধরে বৈদিক রণাঙ্গনের সিংহবাহিনী দেবী কখন যেন হয়ে উঠলেন বাঙালির ঘরের মেয়ে উমা—যিনি চার সন্তান ও নবপত্রিকাকে সঙ্গে নিয়ে বছরে চারটি দিনের জন্য বাপের বাড়িতে আসেন। গম্ভীর মহাশক্তির সঙ্গে যুক্ত হল মেনকার মাতৃস্নেহ ও বাৎসল্য রস।
মূলত মঙ্গলকাব্যের হাত ধরেই মহামায়ার প্রাথমিক এই রূপ পরিবর্তন। বঙ্গে আদ্যাশক্তি কেবলই মা, তিনিই পরম স্নেহের কন্যা আবার তিনিই আমাদের দুর্গতিনাশিনী। সুপ্রাচীন শাক্ত সম্প্রদায়ের সুগভীর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে পালিত হয় এই শারদোৎসব। শাক্ত প্রথা অনুযায়ী দুর্গাপূজায় তাই বলিদান ও আমিষের বহুল ব্যবহার। জৈন ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্মের এবং বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রভাবিত দেশের উত্তর কিংবা পশ্চিমাঞ্চলের ভারতীয়রা অবশ্য ভ্রুকুঞ্চিত করলেও শাক্ত দর্শনানুসারে দুর্গাপূজায় মাছ এবং মাংসের বহুল ব্যবহার। এই ভাবধারা থেকেই বাঙালির আমিষের প্রতি আগ্রহ বিশ্বজনীন। এর পেছনে রয়েছে গূঢ় শাক্ত চিন্তা। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যর জন্মভূমি এবং কর্মভূমি মূলত এই বঙ্গভূমে হওয়ার কারণে তাঁর প্রচারিত এবং প্রসারিত বৈষ্ণবধারা-র প্রভাবও বিস্তর। সেই কারণে বৈষ্ণব মতে রাধামাধবের সাথেই মাতৃপূজার দুর্গাপূজার প্রচলন বঙ্গে আছে ব্যাপকভাবে। সেখানে এমনকি বলিদানের প্রথাতেও আছে কেবল নিরামিষের ব্যবহার। আসলে বাঙালির শারদোৎসব শুধুই শাক্ত কিংবা বৈষ্ণব ভাবধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি নিজেকে, আপামর বাঙালির মতো সেও বদলেছে কখনো তাঁর আঙ্গিকে, কখনো শিল্পশৈলীতে কখনো উপস্থাপনায়।
এই দেবীপূজা পৌরাণিক যুগ থেকে শুরু হয়ে মধ্যযুগ আধুনিক যুগের বিবর্তন পেরিয়ে আজকের রূপ লাভ করেছে। দুর্গাপূজা সকল ধর্মের, বর্ণের সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে গিয়ে হয়েছে সর্বজনীন। আর হয়তো বাঙালির মননে অতি যত্নে লালিত সেই দেবীচিন্তাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে তাঁর চিন্তায় তাঁর ভাবনায় তাঁর কৃষ্টিতে আর সৃষ্টিতে। বিজয়ার অশ্রুভেজা “আসছে বছর আবার হবে”-র মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এই চিরন্তন আদিশক্তির পুনর্জাগরণের অনন্ত প্রতীক্ষা।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.