বিশ্ব রাজনীতির মহা-অগ্নিকাণ্ড: জায়নবাদ, অস্ত্র ব্যবসা ও বিশ্ব অর্থনীতির মরণফাঁদ
ইতিহাসের এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে মানবসভ্যতা। চারদিকে তাকালে মনে হয়, একটি বিশাল বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক বিশ্ব, যার প্রতিটি কোণায় একে একে আগুন জ্বলছে। ইউরোপ জ্বলছে ইউক্রেন যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মন্দায়; আফ্রিকা পুড়ছে খনিজ সম্পদের নগ্ন লুণ্ঠনে; লাতিন আমেরিকা ধুঁকছে রাজনৈতিক অস্থিরতায়। আর মধ্যপ্রাচ্য পরাশক্তিদের ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে এক জ্বলন্ত চুল্লি, যেখানে ফিলিস্তিনের গাজায় ইতিহাসের অন্যতম নির্মম গণহত্যা চালানো হয়েছে।
বাকি ছিল কেবল তথাকথিত 'মুক্ত বিশ্বের নেতা' আমেরিকা। কিন্তু মার্কিন মসনদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি তার শর্তহীন উগ্র সমর্থন সেই আমেরিকাতেও নৈরাজ্যের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়েছে। তবে এই বৈশ্বিক অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্য কারণ কেবল কয়েকজন উগ্র রাজনীতিকের উন্মাদনা নয়। এই কলামের পূর্ণতা আসবে না, যদি না আমরা এই ধ্বংসলীলার মূল চালিকাশক্তি—জায়নবাদ (Zionism), বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার সেই ট্রিপল-অক্ষ বা মরণফাঁদকে উন্মোচন করি।
১. ইউরোপের দহন: গাজার নীরবতার অর্থনৈতিক ও নৈতিক শাস্তি
গাজায় যখন হাজার হাজার শিশুকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছিল, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিংহভাগ নেতা নীরব ছিলেন। আজ ইউরোপের রাজপথে যে অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতি, তা আসলে এই নৈতিক পতনেরই এক অনিবার্য ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক কর্মফল।
নিজেদের ক্ষুব্ধ সাধারণ নাগরিকদের শান্ত করতে ইউরোপীয় নেতারা পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করলেও ইসরায়েলের সাথে মূল অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সাহস দেখান না। কারণ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেনের মূল নীতিনির্ধারণী কাঠামো এখন এমন এক অর্থনৈতিক বেড়াজালে বন্দী, যেখানে মানবতার চেয়ে মুনাফাই শেষ কথা।
২. জায়নবাদী লবি, ওয়াল স্ট্রিট এবং বিশ্ব অর্থনীতির ব্ল্যাকহোল
বিশ্ব রাজনীতির এই নগ্ন দ্বিচারিতা বোঝার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট (Wall Street) এবং জায়নবাদী লবিং সংস্থাগুলোর গভীর যোগসূত্রের মধ্যে Monthly Review।
* পুঁজির নিয়ন্ত্রণ: বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট কর্পোরেশন এবং হেজ ফান্ডগুলো (যেমন ব্ল্যাকরক, ব্ল্যাকস্টোন বা স্টেট স্ট্রিট) বিশ্ব অর্থনীতির চাকা নিয়ন্ত্রণ করে Responsible Statecraft, যা জায়নবাদী ভাবাদর্শ এবং ইসরায়েলি প্রযুক্তি ও প্রাকৃতিক গ্যাস খাতের সাথে গভীরভাবে যুক্ত Monthly Review।
* রাজনীতির অর্থায়ন: আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (AIPAC)-এর মতো শক্তিশালী লবিং গ্রুপগুলো মার্কিন ও পশ্চিমা নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢেলে প্রার্থীদের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে Anews। এই চক্রের বাইরে গিয়ে কোনো পশ্চিমা রাজনীতিবিদের পক্ষে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। ফলে মুখে গাজার জন্য চোখের জল ফেললেও, তারা কার্যত জায়নবাদী অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের পুতুলে পরিণত হয়েছেন।
৩. রক্তে ভেজা মুনাফা: ‘মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ ও অস্ত্র ব্যবসা
যুদ্ধ কেবল ধ্বংসই আনে না, এটি নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মুনাফাও তৈরি করে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ সচল রাখা এই সামরিক-শিল্প খাতের (Military-Industrial Complex) জন্য অত্যন্ত জরুরি Anews।
* আমেরিকার সাহায্য ও অস্ত্র রিসাইক্লিং: যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ইসরায়েলকে যে আনুমানিক $৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়, তার সিংহভাগ অর্থ কিন্তু ঘুরেফিরে আমেরিকারই শীর্ষ প্রতিরক্ষা ঠিকাদার (যেমন লকহিড মার্টিন, বোয়িং এবং রেথিয়ন)-এর পকেটে যায় Anews। ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো এই লাইভ গণহত্যা আসলে পশ্চিমা অস্ত্র নির্মাতাদের লভ্যাংশ (Dividend) বৃদ্ধির এক নির্মম উৎসব Responsible Statecraft।
* ইসরায়েলের রেকর্ড অস্ত্র রপ্তানি: সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, গাজা, লেবানন ও ইরানে একের পর এক যুদ্ধ ফ্রন্ট চালু থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা রপ্তানি সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে AP News। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (SIBAT) তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সমালোচনা উপেক্ষা করেই বার্ষিক প্রতিরক্ষা রপ্তানি প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়ে নজিরবিহীন $১৯.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে Calcalistech।
* ‘ব্যাটল-টেস্টেড’ অস্ত্রের বাজার: ইউরোপের দেশগুলোই (যেমন জার্মানির কাছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা 'অ্যারো ৩' বিক্রি) এই অস্ত্রের অন্যতম প্রধান ক্রেতা Times of Israel। বৈশ্বিক শক্তিগুলো ইসরায়েলি অস্ত্র কিনছে কারণ এগুলো গাজার অসহায় মানুষের ওপর সরাসরি প্রয়োগ করে "ব্যাটল-টেস্টেড" বা যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত হিসেবে বিশ্ববাজারে প্রমাণিত হয়েছে AP News।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা রপ্তানির সাম্প্রতিক উল্লম্ফন (বিলিয়ন ডলারে):
┌───────────────────────────────┬───────────────────────────────┐
│ ২০২৪ │ ২০২৫ │
├───────────────────────────────┼───────────────────────────────┤
│ $১৪.৮ │ $১৯.২ │
└───────────────────────────────┴───────────────────────────────┘
(উৎস: ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় / SIBAT)
৪. ট্রাম্প-নেতানিয়াহু অক্ষ এবং আসন্ন মার্কিন নৈরাজ্য
আমেরিকা এতদিন দূর থেকে অন্য দেশে আগুন জ্বালিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করত। কিন্তু ট্রাম্পের আগমন এবং নেতানিয়াহুর অঢেল প্রশংসা করার মধ্য দিয়ে আমেরিকা নিজের ঘরেই আগুনের কাঠি জ্বালিয়ে দিয়েছে।
নেতানিয়াহুর চরমপন্থী নীতিকে ট্রাম্পের এই নিঃশর্ত সমর্থন মধ্যপ্রাচ্যকে তো বটেই, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আমেরিকার একটি বিশাল প্রগতিশীল তরুণ প্রজন্ম, মুসলিম সমাজ এবং বিবেকবান নাগরিকেরা এই দ্বিচারিতা আর মেনে নিতে পারছে না। ফলে, ইউরোপের রাজপথে আজ বর্ণবাদ ও অভিবাসী-বিরোধী যে দাঙ্গা ও নৈরাজ্য দেখা যাচ্ছে, তা খুব শীঘ্রই আরও তীব্র ও সশস্ত্র রূপ নিয়ে আমেরিকার রাস্তায় আছড়ে পড়বে।
৫. বদলটা কেমন হবে এবং এর যন্ত্রণা কতটা ভয়াবহ?
পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, কিন্তু এই বদল কোনো শান্তিময় নতুন সকাল আনছে না; এটি আনছে এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার।
* আন্তর্জাতিক আইনের আনুষ্ঠানিক মৃত্যু: জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শক্তিশালী দেশগুলোর হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে Cambridge University Press। বিশ্ব এখন "জোর যার মুল্লুক তার" নীতিতে ফিরে যাচ্ছে।
* অর্থনৈতিক ধস ও সামাজিক বিদ্রোহ: লজিস্টিক চেইন ভেঙে পড়া, জ্বালানি সংকট এবং লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের যাতনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যা বিশ্বজুড়ে গৃহযুদ্ধ ও লুটপাটকে উস্কে দেবে।
উপসংহার
গাজায় ফিলিস্তিনিদের রক্ত নিয়ে যে হোলিখেলা পশ্চিমা বিশ্ব মুখ বুজে উপভোগ করেছিল এবং যে জায়নবাদী পুঁজি ও অস্ত্র ব্যবসা একে টিকিয়ে রেখেছিল, আজ সেই আগুনের আঁচ তাদের নিজেদের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যখন কোনো সভ্যতা নৈতিকভাবে অন্ধ হয়ে যায়, কর্পোরেট লোভ আর অস্ত্রের মুনাফাকে মানুষের জীবনের চেয়ে বড় করে দেখে, তখন সেই সভ্যতার পতন অনিবার্য। ইউরোপ ও আমেরিকার আজকের এই আসন্ন নৈরাজ্য ও অর্থনৈতিক দহন সেই ঐতিহাসিক ও জাগতিক কর্মফলেরই এক অমোঘ অধ্যায়।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.