প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:৩৫
ফিলাডেলফিয়ার টেম্পল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের করিডরে তাঁকে সবাই চেনে ‘টপ ডক্টর’ হিসেবে। আর সাড়ে বারো হাজার কিলোমিটার দূরে সিলেটের নাজিরগাঁওয়ে, টেমুখীর এক রোগী চেনে তাঁকে ‘যে মানুষটা আমার ডায়ালাইসিস ফ্রি করে দিয়েছেন’ হিসেবে। দুই প্রান্তের এই দুই পরিচয়ের মাঝে সেতু হয়ে আছেন একজন মানুষ — অধ্যাপক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ।
যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা চিকিৎসক হয়েও শেকড় ভোলেননি তিনি। বরং শেকড়কেই বানিয়েছেন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
শহীদ পিতার সন্তান, শিক্ষকের ঘরের মানুষ
ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদের গল্প শুরু হয় সিলেট থেকেই। তিনি শহীদ অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দিন আহমেদ, এফআরসিএস-এর সন্তান। ডা. শামসুদ্দিন ছিলেন সিলেট মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের প্রধান। ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তিনি শহীদ হন। তাঁর মা হোসনে আরা আহমেদ ছিলেন শিক্ষাবিদ, সিলেট মহিলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করা এই নারী আমৃত্যু নারী শিক্ষার জন্য কাজ করেছেন।
এমন পরিবারে জন্ম বলেই হয়তো চিকিৎসা আর শিক্ষা — দুটোই তাঁর রক্তে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে-২৯ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৭৭ সালে ঢাকা থেকে এমবিবিএস শেষ করে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। মার্সি ক্যাথলিক মেডিকেল সেন্টার এবং মেডিকেল কলেজ অব পেনসিলভানিয়ায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ শেষে তিনি হয়ে ওঠেন আমেরিকার অন্যতম সেরা নেফ্রোলজিস্ট।
আজ তিনি একসঙ্গে পাঁচটি বিষয়ে আমেরিকান বোর্ড সার্টিফাইড — ইন্টারনাল মেডিসিন, নেফ্রোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন, জেরিয়াট্রিক মেডিসিন এবং ক্লিনিক্যাল হাইপারটেনশন। বর্তমানে তিনি লুইস কাটজ স্কুল অব মেডিসিন অ্যাট টেম্পল ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল মেডিসিনের অধ্যাপক এবং ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটি কলেজ অব মেডিসিনের প্রফেসর ইমেরিটাস হিসেবে কর্মরত। তাঁর বিশেষ আগ্রহ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগের চিকিৎসা ও গবেষণায়।
এই অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানজনক এলিস আইল্যান্ড মেডেল অব অনার। আর ফিলাডেলফিয়া ম্যাগাজিনের বিচারে চিকিৎসকদের প্রত্যক্ষ ভোট ও পিয়ার-রিভিউর ভিত্তিতে ২০২৬ সালেও তিনি নির্বাচিত হয়েছেন ‘টপ ডক্টর’ হিসেবে। টানা কয়েক বছর ধরে তিনি এই তালিকায় নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
সিলেটে ফেরা: একটা স্বপ্নের নাম কিডনি ফাউন্ডেশন
আমেরিকায় সাফল্যের চূড়ায় থেকেও তাঁর মন পড়ে থাকত সিলেটে। তিনি দেখতেন, কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে কত মানুষ ঢাকায় ছুটছে, কতজন টাকার অভাবে চিকিৎসা না পেয়ে চলে যাচ্ছে। সেই কষ্ট থেকেই জন্ম নেয় কিডনি ফাউন্ডেশন সিলেট।
এটি শুধু একটি হাসপাতাল নয়, তাঁর ভাষায় এটি একটি ‘ড্রিম প্রজেক্ট’। ১৯৮৬ সাল থেকে কিডনি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করা এই চিকিৎসক, তাঁর দুই সহযোদ্ধা প্রয়াত জাহিন আহমেদ এবং কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুস সালাম, বীর প্রতীককে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন এই যাত্রা। তাঁদের অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর মা এবং ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ।
শুরুটা হয়েছিল শাহজালাল উপশহরে ১২ হাজার বর্গফুটের একটি ভাড়া বাসায় ছোট্ট ডায়ালাইসিস সেন্টার দিয়ে। সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ বিশাল মহীরুহ।
নাজিরগাঁও, টেমুখীতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে গড়ে উঠেছে ২০০ শয্যার অত্যাধুনিক কিডনি হাসপাতাল। স্থানীয় ব্যবসায়ী লায়ন জুবায়ের আহমেদ চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের দান করা জমিতে ২০১৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি শেষ হয়। প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই হাসপাতালটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে পুরোদমে চালু হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
আজ যখন সিলেটের কোনো রিকশাচালক, কোনো গৃহিণী স্বল্প খরচে বা বিনামূল্যে ডায়ালাইসিস নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফেরেন, তখনই সার্থক হয় ফিলাডেলফিয়া থেকে ঢাকার হৃদয়ে ছুটে চলা এই চিকিৎসকের অর্ধশতাব্দীর লড়াই।
লাইফস্টাইল থেকে আরো পড়ুন