তথ্য প্রযুক্তি

৫৯২ কোটি টাকায় খনন হবে দুটি নতুন কূপ, বাড়বে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ০২:৩৭

৫৯২ কোটি টাকায় তিতাসে খনন হবে দুটি নতুন কূপ, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস

 

নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক প্রথমা

 

দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি নতুন অনুসন্ধানমূলক ও উন্নয়ন কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ‘তিতাস-৩২’ ও ‘তিতাস-৩৩’ নামের কূপ দুটি খননে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। কূপ দুটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) এ তথ্য জানান। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পেট্রোবাংলার অধীন বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

 

সরকারি ও কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়ন

 

প্রকল্পের মোট ব্যয় ৫৯২ কোটি টাকার মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

 

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ৬৩২ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের ১৮ জুন অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়। পরবর্তী পর্যালোচনায় প্রস্তাবিত ব্যয় ৪০ কোটি টাকা কমিয়ে ৫৯২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য

 

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানের তথ্য অনুযায়ী, নতুন দুটি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কূপ দুটি থেকে দৈনিক প্রায় ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

 

কনডেনসেট হলো প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে পাওয়া তরল হাইড্রোকার্বনজাত পদার্থ, যা জ্বালানি ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়।

 

প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, কূপ দুটি থেকে ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। তবে প্রকৃত উৎপাদন নির্ভর করবে কূপের ভূতাত্ত্বিক অবস্থা, গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর।

 

গ্যাস আমদানির নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ

 

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি সরকারের জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। নতুন কূপ দুটি থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হলে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ব্যবহারের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

প্রকল্প প্রস্তাবের হিসাব অনুযায়ী, কূপ দুটি থেকে ১০ বছরে উৎপাদিত গ্যাস ও কনডেনসেটের আনুমানিক মূল্য বর্তমান উৎপাদনস্থলের মূল্য বা ওয়েলহেড প্রাইস বিবেচনায় ৩৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্যাসের মূল্য ২৮৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং কনডেনসেটের মূল্য ৫৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

 

অন্যদিকে, ভোক্তা পর্যায়ের গ্যাসের দাম বিবেচনায় একই সময়ে উৎপাদিত গ্যাসের আনুমানিক মূল্য দাঁড়াতে পারে ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। তবে এই হিসাব উৎপাদনস্থলের মূল্য ও ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যের পার্থক্যের কারণে ভিন্ন; একে সরাসরি প্রকল্পের নিট মুনাফা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

 

তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে বর্তমান উৎপাদন

 

বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের ছয়টি উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৮০ থেকে ৪৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

 

কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে খনন করা ২৮টি কূপের মধ্যে ২৩টি থেকে দৈনিক প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে।

 

২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে পরিচালিত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের জন্য বিজিএফসিএল চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (সিএনপিসি) প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেডকে নিয়োগ করেছিল। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি ওই দুই গ্যাসক্ষেত্রে ১৬টি নতুন কূপ ও সাতটি গভীর কূপ খননের সুপারিশ করে।

 

২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ৩০০ কূপ খননের লক্ষ্য

 

দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সালের মধ্যে স্থলভাগে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর পরবর্তী সময়ে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, পরিকল্পনা অনুযায়ী দুই পর্যায়ে মোট ৩০০টি কূপ খননের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

 

তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ কূপ দুটি এই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। প্রকল্পের আওতায় কূপ খননের পাশাপাশি গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন স্থাপন, দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগত কাজ করার প্রস্তাব রয়েছে।

 

২০২৬ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে। পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সহায়তা করতে পারে।

 

তবে প্রকল্পটির ব্যয়, নির্ধারিত সময়ে খননকাজ সম্পন্ন করা এবং প্রত্যাশিত উৎপাদন নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয়ই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে জাতীয় গ্রিডে নতুন গ্যাস যুক্ত হওয়ার সময়সূচি।

 

সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), News24BD ও সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিবেদন।

তথ্য প্রযুক্তি থেকে আরো পড়ুন


বিজ্ঞাপন