জাতীয়

নতুন বই ছাপায় পিছিয়ে মাধ্যমিক, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সরবরাহের লক্ষ্য

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪৫

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দিতে জোর প্রস্তুতি চলছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের সব শ্রেণির মানসম্মত পাঠ্যবই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার অগ্রগতি তুলনামূলক সন্তোষজনক হলেও মাধ্যমিক স্তরে এখনো পিছিয়ে রয়েছে মুদ্রণকাজ।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ২৮ অক্টোবরের মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক্‌-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৯৩ শতাংশ বই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তর মিলিয়ে বই ছাপার অগ্রগতি ৫৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বিশেষ করে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই মুদ্রণে ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে পিছিয়ে থাকা ছাপাখানাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে এনসিটিবি। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ইতোমধ্যে ৩২টি ছাপাখানাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

ছাপানো হবে ৩০ কোটি ৭১ লাখের বেশি বই

এবার ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সারা দেশে ৬২৩টি লটে ১১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ পেয়েছে। প্রাক্‌-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তর মিলিয়ে মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বইও রয়েছে।

গত বছরের তুলনায় এবার এক মাস আগে মুদ্রণকাজ শুরু করা হয়েছে। এরপরও কয়েকটি শ্রেণির বই ছাপায় ধীরগতির কারণে কাজের গতি বাড়াতে তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।

প্রাথমিকের বই ছাপায় অগ্রগতি বেশি

এনসিটিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক্‌-প্রাথমিক স্তরে ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টি ছাপা হয়েছে। এ স্তরে মুদ্রণ অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ২১ শতাংশ।

প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বই ছাপানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে ৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৯ হাজার ১৭৩টি বই ছাপা হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

অন্যদিকে ইবতেদায়ি স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি বইয়ের মধ্যে ২ কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার ৭৮৪টি ছাপা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি ৬৪ দশমিক ১৫ শতাংশ।

মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি বই ছাপানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে ৯ কোটি ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৬টি বই ছাপা হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ।

পিছিয়ে থাকা ছাপাখানার কাজ বাতিল হতে পারে

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানিয়েছেন, মুদ্রণকাজে ধীরগতির কারণে ৩২টি প্রেসকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ বাতিল করে অন্য ছাপাখানার মাধ্যমে বই ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি জানান, প্রাক্‌-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ ৯০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে। ইবতেদায়ি এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই ছাপার কাজও অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। তবে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপায় গতি কম। কয়েকটি লটে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বইয়ের মান ও মুদ্রণের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এবং সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একাধিক দল মাঠপর্যায়ে তদারকি করছে।

বাতিল ৯ লাখ ফর্মা ও ১২ হাজার বই

নতুন পাঠ্যবইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে শিক্ষা প্রশাসন। এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ৫৩টি মনিটরিং দল মুদ্রণকাজ তদারকি করছে।

পরিদর্শনে মানদণ্ড পূরণ না করায় ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের ৯ লাখ ফর্মা এবং ১২ হাজার নিম্নমানের ছাপানো বই বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস, আলিফ প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং, আনন্দ প্রিন্টিং প্রেস, আমিন আর্ট প্রেস, অনিন্দ্য প্রিন্টিং প্রেস ও অনুপম প্রিন্টিং প্রেস রয়েছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, বইয়ের মানের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ মানসম্মত বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই নিয়ে উদ্বেগ

অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি অত্যন্ত কম। চুক্তি অনুযায়ী, ৩ নভেম্বরের মধ্যে এসব শ্রেণির ৫০ শতাংশ বই উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ করার কথা রয়েছে। কিন্তু ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে থাকা কয়েকটি লটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মতো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানিয়েছেন, নির্ধারিত রোডম্যাপ অনুযায়ী বই ছাপা ও সরবরাহের কাজ চলছে। চলতি মাসের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের বই মুদ্রণের হার ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের ৯৫ শতাংশের বেশি বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এবার বই গ্রহণের সময় জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সরাসরি বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বই গ্রহণের পর মানের কোনো বিচ্যুতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

নিম্নমানের বই সরবরাহে ছাড় নয়

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, উপজেলা পর্যায়ে নিম্নমানের কাগজে ছাপানো বই সরবরাহ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। সরকার বাজারদর যাচাই করে বই মুদ্রণের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করেছে, যাতে কম দামের অজুহাতে নিম্নমানের বই তৈরির সুযোগ না থাকে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

সরকারের লক্ষ্য, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে সব মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া, যাতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা নতুন বই হাতে পায়।

জাতীয় থেকে আরো পড়ুন